ডিপ্রেশন

ডিপ্রেশন

অনেকেই ভাবেন যে, তাদের যৌন চাহিদা বেশি। তাই তারা পর্ন আসক্ত। কিন্তু এ ব্যাপারটা শতকরা ১০ ভাগ ক্ষেত্রে হতে পারে; বাকি ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আসক্ত ব্যক্তি জীবনে অন্য কোনো সমস্যায় ভুগছিলেন। হতে পারে ডিপ্রেশন (depression), অ্যানজায়েটি (anxiety), ভঙ্গুর সম্পর্ক, আত্মসম্মানবোধের অভাব, ছোটবেলায় পাওয়া কোন মানসিক আঘাত, উগ্র জীবনযাত্রা বা অন্য কিছু। সেগুলো ভুলে থাকার জন্য তিনি পর্ন দেখেন। এক্ষেত্রে তার চিকিৎসা শুরু করতে হবে সেই সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমে। তা না হলে, একধাপ এগিয়ে দশধাপ পিছিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে।

আবার অনেক সময়, পর্ন আসক্তি থেকে বিভিন্ন মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয় বা আগে সৃষ্ট সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করে। এ পর্যন্ত আমাদের কাছে যারা মেসেজ করেছেন, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই ডিপ্রেশন (depression) খুব কমন একটা সমস্যা। আমরা জীবনে বিভিন্ন কারণে কম-বেশি ডিপ্রেসড (depressed) হই। কিন্তু ডিপ্রেসড হওয়া আর ডিপ্রেশনে (depression) ভোগা এক জিনিস নয়। এটা একটা মানসিক রোগ।

ব্যক্তি ভেদে এ রোগের বিভিন্ন কারণ থাকে। তবে কিছু কমন কারণ আছে:

১) একাকীত্ব
২) নিরাপত্তাহীনতা
৩) অপমানবোধ
৪) মৃত্যুশোক
৫) বংশগত প্রভাব (পরিবারে কারো ডিপ্রেশন থাকলে তা অন্যদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে)
৬) ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
৭) জীবনে হঠাৎ বড় কোন পরিবর্তন
৮) বড় কোনো রোগের প্রভাব

ডিপ্রেশন ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় সাধারণ উপদেশ বা অনুপ্রেরণায় কাজ হয় না; বরং ডিপ্রেশনে ভোগা একজন ব্যক্তিকে কোনো কাজ করতে বলার পর তা যদি তারা করতে না পারে তখন তাদের মধ্যে অনুশোচনা বাড়ে। ফলে ডিপ্রেশন আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে।

ডিপ্রেশনে পড়লে যার-তার কাছে সমাধান খোঁজা উচিত না। কারণ, অজ্ঞতার কারণে দেওয়া ভুল সমাধান অনেক সময় ডিপ্রেশন বাড়িয়ে দেয়। আমাদের কাছে পর্ন আসক্তির সমস্যা নিয়ে আসা কোনো ব্যক্তির সব কথা শুনে আমরা যখন বুঝতে পারি যে, সে ডিপ্রেশনে ভুগছে, তখন আমরা তাকে কোনো চিকিৎসকের (সাইকিয়াট্রিস্ট) পরামর্শ নিতে বলি। কারণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তাই পর্ন আসক্তি থেকে মুক্তির টিপস্‌ অনুযায়ী তারা কাজ করতে পারে না।

রোগীর অবস্থা যাচাই করে সাইকিয়াট্রিস্টরা অল্প কিছুদিনের ঔষধ দেন। এরপর নির্দিষ্ট সময়ে মানসিক অবস্থা অনুযায়ী অন্যান্য সমাধান দিতে থাকেন।

কখন বুঝবেন আপনি ডিপ্রেশনে ভুগছেন এবং আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?

৩টি দিক থেকে এই অবস্থা যাচাই করা হয়: ১) mood, ২) thought এবং ৩) behavior

১) mood: কমপক্ষে ২ সপ্তাহ টানা মন খারাপ থাকবে এবং এক একটি দিনের বেশিরভাগ সময়ই মন-মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকবে। এ অবস্থাকে ক্লিনিকাল ডিপ্রেশনের লো মুড বলা হয়। এ ছাড়াও mood হঠাৎ ভাল আবার হঠাৎ খারাপ হয়ে যাবে।

২) thought: নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার উদ্ভব হয়। নিজের আশেপাশের কিছুই ভালো লাগে না এবং ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হয়।

৩) behavior: আগে যা ভালো লাগত না তা ভাল লাগবে না।

এ ছাড়াও কাজের প্রতি অনীহা, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন (খুব বেশি বা খুব কম খাওয়া) কিংবা দীর্ঘকালীন অনিদ্রা দেখা দিতে পারে।

আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক পদক্ষেপটি নিন। আপনি এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ লাভ করবেন। তা ছাড়া আপনি যদি ডিপ্রেশনের কারণে পর্ন আসক্ত হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে আসক্তি অনেকটাই কমে যাবে। তখন আসক্তি থেকে পুরোপুরি মুক্তিলাভের জন্য টিপস্‌ অনুসরণ করাটাও আপনার জন্য ফলপ্রসূ হবে। ইনশা আল্লাহ্‌।

আমাদের পেইজে মেসেজ করা এক ভাইয়ের গল্প শেয়ার করছি আপনাদের সাথে (তার অনুমতি নেওয়া হয়েছে)…

কিছুদিন আগেই তিনি মেসেজ করেছিলেন। ফোনে নিজের সমস্যা শেয়ার করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু প্রথমেই নাম্বার না দিয়ে মেসেজে তার অবস্থা যাচাই করার চেষ্টা করছিলাম। তবে তিনি ফোনেই সব কথা বলবেন বলে মনস্থির করায় তেমন কিছু জানা সম্ভব হয়নি।

যাই হোক, একদিন পর তার সাথে ফোনে কথা হল। সমস্যা শুরু হয়েছিল চাইল্ড অ্যাবিউসের (child abuse) মাধ্যমে। এখানে তিনি একজন ভিকটিম। ছোটবেলা থেকে বাবা-মা দুজনেই জব করায় তাদের সঙ্গও তেমন একটা পাননি। তাই নিজের মধ্যেই বাজে স্মৃতিগুলো পুষতে থাকেন। অপ্রাপ্ত বয়সেই নিজের সেক্সচুয়ালিটি নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে মাথার ভেতর। এ ছাড়াও বাবা-মায়ের সাথে দূরত্ব তার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বেশ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ষষ্ঠ শ্রেণীতে ঘটে যায় আরও বড় সমস্যা। বন্ধুদের মাধ্যমে পরিচিত হন পর্নের সাথে। ছোটবেলা থেকেই যৌনতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছিলেন সেগুলো জানার কৌতূহল নিয়েই প্রবেশ করেন পর্নের অন্ধকার জগতে। কিন্তু ব্যাপারটা প্রশ্নের উওর জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে গেলেন পর্ন আসক্ত।

একসময় প্রচুর স্বপ্নদোষ হতে থাকে। এতে তিনি বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সেক্সচুয়াল বিষয়ে অনভিজ্ঞ একজন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর তিনি তাকে মাস্টারবেট করার করার উপদেশ দেন (ভুল ট্রিটমেন্ট)। ফলে তিনি পর্নের সাথে ধীরে ধীরে মাস্টারবেশনেও আসক্ত হয়ে পড়েন। একাকীত্ব ও ছোটবেলার সেই জঘন্য স্মৃতি তাকে আরও বেশি হতাশ করে ফেলে। নেতিবাচক সেই চিন্তাগুলো থেকে কোনোভাবেই বের হতে পারছিলেন না। কারও সাথে শেয়ারও করছিলেন না।

এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, তার মনে হচ্ছে ইরেক্টাইল ডিসফাংশন হয়ে গেছে। এ ছাড়াও প্রচুর নেতিবাচক চিন্তা বয়ে বেড়াচ্ছেন। আমার সাথে অনেক কিছুই শেয়ার করছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেও জানেন না তার কথা কখন শেষ হবে। তারপরও কথা বলতে চাচ্ছেন। না জানা অনেক প্রশ্নের উওর জানতে চাচ্ছেন। কষ্ট শেয়ার করার মানুষ খুঁজছেন। অথচ ওনার বাবা-মা কিছুই জানেন না।

তার চেয়ে বড় কথা, তিনি অনেকদিন ধরে ডিপ্রশনে ভুগছেন। পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে পারছেন না। অনেক কিছুই ভুলে যান। বেশিরভাগ সময়ই ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ভুগেন। আসলে ডিপ্রেশনে ভোগা একজন মানুষ তার চিন্তাগুলোকে এমনভাবে ফিল্টার করেন যেখানে ভাল চিন্তাগুলো সব বের হয়ে যায়। থেকে যায় শুধু নেতিবাচক চিন্তা। ওনার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। এ ছাড়াও উনি পারফেকশন নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত থাকেন। এটা আমি এমন না করে এমন করতে পারতাম। কেন করলাম এমন? এখন কি আমি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব? এটা কি সম্ভব?

কিন্তু আমরা কেউই পারফেক্ট না। অথচ উনি খুব ছোটখাটো ভুলও খুব বড় করে দেখছেন। এই পারফেক্ট হওয়ার চিন্তাকে বলা হয় ‘Black and White thinking’। আর এ ধরনের বিকৃত চিন্তাগুলোকে বলা হয় ‘Cognitive Distortions’। এই চিন্তাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই ধীরে ধীরে ডিপ্রেশন থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হয়। কিন্তু অনেকদিন ধরে ডিপ্রেশনে ভোগায় তার পক্ষে এ চিন্তাগুলো থেকে বের হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তাই আমি তাকে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিতে বলেছি। যদিও এ কাজটা আরও আগেই করা দরকার ছিল। কিন্তু এখনও তার বাবা-মা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেয় আশা করি তিনি সুস্থ হবেন। ইনশা আল্লাহ্‌।

এই ঘটনা থেকে আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, ব্যাপারগুলো কতোটা জটিল আকার ধারণ করতে পারে। এই ভাইয়ের বয়স খুবই কম। এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ওনার মতো আরও অনেকেই এমন সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় সমস্যা জটিল আকার ধারণ করছে। একসময় নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাচ্ছে।

এক্ষেত্রে বাবা-মারা আরও বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। এমন অনেক পরিবার আছে যেখানে বাবা-মা দুজনই নিশ্চিন্তে চাকরী করছেন। আর ছেলেকে ছেড়ে দিয়েছেন কাজের মেয়ের হাতে। এমন অবস্থায় সেক্সচুয়ালি অ্যাবিউসড হওয়া অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও বেশি হয় যখন বাসায় কাজের ছেলে থাকে। কিন্তু মায়েরা যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করত তাহলে হয়ত এ ছেলেমেয়েগুলোকে এভাবে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হত না।

#teamFAD

COMMENTS

WORDPRESS: 0