নীল পর্দার পেছনে সাদাকালো জগত

নীল পর্দার পেছনে সাদাকালো জগত

আপনি কি এমন কোন ব্যবসাকে সমর্থন করবেন, যে ব্যবসার সাথে সম্পর্কিত নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার (হয়তো সবাই না)? পর্ন অবমাননাকর সব যৌন নির্যাতনে পরিপূর্ণ। সেখানে কর্মরত নারীরা স্বেচ্ছায় এসব মেনে নেয় না। কিন্তু পর্নোগ্রাফাররা ব্যাপারগুলো লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে চায়।

একজন সাবেক পর্ন অভিনেত্রী বলেন[১],
“আমার উপর তারা শারীরিক নির্যাতন চালাত… অধিকাংশ মেয়েরাই কাঁদত, তাদেরও অস্বাভাবিক কষ্টের মধ্যে থাকতে হত… আমি নিশ্বাস নিতে পারতাম না। তারা আমাকে মারত, আমার গলা টিপে ধরত। আমি অনেক কষ্ট পেতাম। তারপরও তারা থামত না। অনবরত শুটিং করে যেত। আমি তাদেরকে অনুরোধ করতাম ক্যামেরা বন্ধ করতে, কিন্তু তারা শুটিং করেই যেতো…”

২০০৪ সালের ঘটনা,
ইরাক দখলের সময় আমেরিকান সৈন্যরা আবু গারিবে বন্দীদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। সারা বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিলো সেই নির্যাতনের কথা জেনে। শত-শত প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়- ইরাকি বন্দীরা শরীরে শিকল এবং মাথায় আন্ডারওয়্যার পড়া অবস্থায় মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছে, কখনো অন্য বন্দীর শরীর স্পর্শ করছে, ক্যামেরার সামনে মাস্টারবেট করছে। এ সব কাজই তারা করছে বাধ্য হয়ে। এমন আরও অনেক অবমাননাকর কাজ যা আমাদের পক্ষে এখানে উল্লেখ করা সম্ভব না। সাধারণ মানুষেরা তাদের এই নির্যাতনের চেয়ে গর্বের সাথে এ সকল দৃশ্য রেকর্ড করতে দেখে বেশি আতঙ্কিত হয়েছিল। অনেক ছবিতেই আমেরিকান সৈন্যরা বন্দীদের শরীরের উপর দাঁড়িয়ে, মুখে বিজয়ের হাসি নিয়ে ‘থাম্বস আপ’ সাইন দেখিয়েছে। তবে তদন্তের পর কিছু সৈন্যকে অসম্মানজনকভাবে চাকরীচ্যুত করা হয় এবং অন্যদেরকে জেল খাটতে হয়[২]।

ওই একই বছরে পর্নোগ্রাফাররা অনেকটা একইভাবে হাজার-হাজার নারীর উপর নির্যাতনের ভিডিও করে এবং ছবি তুলে। সব ইন্টারনেটে পাবলিশ করে লাখ-লাখ পর্ন দর্শকের সামনে তুলে ধরে। অথচ কেউ এ ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কোনো প্রতিবাদ করে না।

পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে যা করা হয়, তা আবু গারিবের সাথে তুলনায় কম কিছু নয়। অনেক দৃশ্য আছে যা দেখলে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাবে। অথচ পশুর চেয়েও জঘন্য পর্নোগ্রাফারদের মতে, সব নারীরা স্বেচ্ছায়, খুশি-মনে পর্নে কাজ করে!

কিন্তু, আসলেই কি তাই? আমরা কি আসলেই নিশ্চিত যে, এই নারীরা প্রত্যেকেই কোনভাবে বাধ্য না হয়ে স্বেচ্ছায় এসকল নির্যাতনের সামনে মাথা পেতে দিয়েছে? পর্ন ইন্ডাস্ট্রির রক্ষাকারী দালালেরা সবসময় এ ধরনের অজুহাত হাজির করে আমাদের সামনে। কিন্তু, এর বেশিরভাগই মিথ্যা। যতোই তাদের সম্মতি[৩] আছে বলে ফাঁকা বুলি ঝাড়া হোক না কেন, বাস্তবে এই নারীদের কষ্টদায়ক সব যৌন নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, বাধ্য করা হয় অমানবিক যৌন ক্রিয়ায় জড়াতে? সত্যি বলতে, নীল পর্দার পেছনের সাদাকালো জগতটা আমরা দেখি না। এটাই পর্ন ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে জঘন্য ও গোপন রহস্য।

অনেকেই ভাবে যে “সেক্স ট্রাফিকিং (sex trafficking) বা মানব পাচার” গরীব দেশগুলোর একটি সমস্যা কিংবা জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি বা চাইল্ড পর্নোগ্রাফি অধিকাংশ সময় দূরের উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই বেশি দেখা যায়।

আসলে সেক্স ট্রাফিকিং (sex trafficking) হচ্ছে, “মডার্ন দাসপ্রথা, যা ইউনাইটেড স্টেট সহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও বিরাজমান। শারীরিক নির্যাতন, হুমকি, মিথ্যাচার এবং বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদেরকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে যৌন ক্রিয়া করতে বাধ্য করাই হচ্ছে সেক্স ট্রাফিকিং[৪]”; এটা এখন পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই বিরাজমান [৫]।

কিছু উদাহরণ দেই।
২০১১ সালে মায়ামিতে নারী পাচারের দায়ে ২ জন যুবককে ৫ বছরের জেল দেওয়া হয়। [৬] তারা মডেলিংয়ের বিজ্ঞাপন দিত। নারীরা বিজ্ঞাপন দেখে আসলে, তাদেরকে গোপনে নেশা-দ্রব্য খায়িয়ে কিডন্যাপ করত। তারপর জোরপূর্বক ধর্ষণ করে ভিডিও করত। পর্ন হিসেবে বিভিন্ন দেশে-বিদেশে, ওয়েবসাইট ও স্টোরে ছড়িয়ে দিতো।

একই বছরে এক দম্পতি মানসিকভাবে অসুস্থ একটি মেয়েকে চাবুক মেরে, দম বদ্ধ করে, ইলেকট্রিক শক দিয়ে, পানিতে চুবিয়ে শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত না মেয়েটি পর্ন ভিডিওতে অংশগ্রহণ করতে রাজি হয়। সেই মেয়েটির নির্যাতিত অবস্থার একটি ছবি হাস্টলার ম্যাগাজিন গ্রুপের একটি পাবলিকেশনের ফ্রন্ট পেইজেও আসে।[৭]

আচ্ছা, বলুন তো, সেই মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়েটি কি “স্বেচ্ছায়” পর্ন ভিডিওতে অংশগ্রহণ করেছিল? আপনি হয়ত বলতে পারেন যে, মেয়েরা নিজের ইচ্ছায় এসকল বিজ্ঞাপনে সাড়া দেয়। কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত পর্ন ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেকটি ভিক্টিম নিজের ইচ্ছায় এ সব করে? আমরা সবাই জানি, অনেকেরই সম্মতি থাকে না, তারা বাধ্য হয় এসব করতে।

পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে রাজি হওয়ার ব্যাপারটা বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। ধরুন, কোন মেয়ে হয়ত তার প্রেমিকের সাথে বিছানায় যেতে রাজি, কিন্তু কোনভাবেই সে নীল পর্দায় বিনোদনের খোরাক হতে চায় না। এখন গোপনে যদি তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ভিডিও করা হয়, তাতে কি তার সম্মতিতে হয়েছে? আবার যদি এমন হয় যে, সে ভিডিওতে অংশগ্রহণ করতে রাজি হয়েছে এটা মেনে যে তা শুধুই তার প্রেমিকের কাছে থাকবে কিন্তু কোনভাবেই অন্য কারো কাছে যাবে না। এমনও হতে পারে যে, ব্ল্যাকমেইল করে কাউকে বাধ্য করা হল? কিংবা তাকে শুধু বিছানায় যেতে রাজি করানো হল, কিন্তু হঠাৎ করেই তার সঙ্গী ভিডিও করা শুরু করলো যার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। এমনকি তার সম্মতিও ছিল না।

এখানে মূল বিষয় হল, কেউ রেইপ পর্ন ছাড়া অন্য কোন পর্ন দেখে কখনই আসল ব্যাপারটা আঁচ করতে পারবে না। শুধুমাত্র কেউ নীল পর্দায় হাজির হল বলেই আপনি ধরে নিতে পারবেন না যে, এই ভিডিও করায় তার সম্মতি আছে… কাউকে বাধ্য করে বা গোপনেও যে এমন কাজ করা যেতে পারে ব্যাপারটা ভুলে যাবেন না।

টানা ৩৫ মিনিট চাবুক ও বেত্রাঘাতের নির্যাতনে সহ্য করা একজন নারী পর্ন অভিনেত্রীর স্বীকারোক্তি, “আমি কখনোই এত জঘন্য নির্যাতনের শিকার হইনি। আমার দেহের বিভিন্ন জায়গায় স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে। আমি কখনোই জানতাম না যে, এই ধরনের নির্যাতনের স্বীকার হতে হবে আমাকে [৮]।”

অর্থাৎ, প্রথমে সে যা করতে রাজি হয়েছিল তা যদি আমরা ‘X’ ধরি, তাহলে পরে তাকে যা করতে বাধ্য করা হয়েছে তা হল X, Y, Z². বুঝতেই পারছেন, ব্যাপারটা দেখতে যেমন মনে হয় আসলে তেমন না।
(দেখুন, আমরা বলছি না যে, পর্ন ইন্ডাস্ট্রির প্রতিটি নারীই নির্দোষ। তাদের অনেকেই প্রথম প্রথম টাকার লোভে এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করে।) আমরা শুধু আপনাদের কাছে সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। কারণ, একজন পর্ন ইউজার আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারগুলো বুঝতে পারে না।

তাহলে এবার বলুন, আপনি কি কখনো এমন কোন কোম্পানির পণ্য কিনবেন যাদের সব না হলেও বেশ কিছু পণ্যের সাথেই মিশে রয়েছে পাচার হওয়া নারী ও শিশুদের হৃদয় চেরা হাহাকার?

অনুবাদ: #teamFAD

রেফারেন্স:
[1] Amis, M. (2001, March 17). A Rough Trade. The Guardian (U.K.), March 17. Retrieved from https://www.theguardian.com/books/2001/mar/17/society.martinamis1
[2] Whisnant, R. (2016). Pornography, Humiliation, and Consent. Sexualization, Media, & Society, 2(3), 1-7. doi:10.1177/2374623816662876
[3] Whisnant, R. (2016). Pornography, Humiliation, and Consent. Sexualization, Media, & Society, 2(3), 1-7. doi:10.1177/2374623816662876; Dines, G., (2010). Pornland: How porn has hijacked our sexuality. Boston, MA: Beacon Press; Dworkin, A., (1980). Pornography: Men possessing women. New York, NY: Penguin Books.
[4] Trafficking Victims Protection Act (TVPA) of 2000. Pub. L. No. 106-386, Section 103 (8) (A).
[5] Peters, R. W., Lederer, L. J., and Kelly, S. (2012). The Slave and the Porn Star: Sexual Trafficking and Pornography. In M. Mattar & J. Braunmiller (Eds.) Journal of Human Rights and Civil Society 5: 1-21. Retrieved from http://www.protectionproject.org/wp-content/uploads/2012/11/TPP-J-HR-Civ-Socy_Vol-5_2012-w-cover.pdf; Malarek, V. (2009). The Johns: Sex for Sale and the Men Who Buy It. (pp. 202-204) New York, NY: Arcade; Farley, M. (2007). Renting an Organ for Ten Minutes: What Tricks Tell Us About Prostitution, Pornography, and Trafficking. In D. E. Guinn & J. DiCaro (Eds.) Pornography: Driving the Demand in International Sex Trafficking, (p. 145). BLoomington, IN: Xlibris. D. M. Hughes. (2000). “Welcome to the rape camp”: Sexual exploitation and the Internet in Cambodia. Journal of Sexual Aggression, 6(1-2), 29-51. doi:10.1080/13552600008413308

COMMENTS

WORDPRESS: 0